ঢাকা 
খবরসত্যের পথে, সময়ের সাথে

বাংলাদেশের অভ্যুত্থান কেন শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভারত থেকে আলাদা

বাংলাদেশ ৩০ জুলাই ২০২৬ ২৭৭৬

ভারতের সাম্প্রতিক ‘তেলাপোকা’দের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গত চার বছরের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ বড় ধরণের সরকারবিরোধী আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের সাক্ষী হলো। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলন সরাসরি সরকারের পতন…

বাংলাদেশের অভ্যুত্থান কেন শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভারত থেকে আলাদা

ভারতের সাম্প্রতিক ‘তেলাপোকা’দের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গত চার বছরের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ বড় ধরণের সরকারবিরোধী আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের সাক্ষী হলো। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলন সরাসরি সরকারের পতন ঘটিয়েছে। ভারতে সে তুলনায় কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্য দিয়েই আন্দোলনের ইতি ঘটেছে।

প্রতিবাদের অভিনব ভাষা ও কৌশলের কারণে ‘জেন-জি’ বর্গ বিশেষ আলোচনায় এসেছে সত্য, তবে এই আলোচনা আদতে নতুন প্রজন্মের প্রতি স্বাভাবিক উচ্চাশার বহিঃপ্রকাশ বলেও চিহ্নিত করা যায়। নতুন প্রজন্মের প্রতি রবি ঠাকুরের বাক্যটাই ইয়াদ করা যেতে পারে, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,/ ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ জেন-জি বর্গের প্রতি সমাজের উচ্চাশার ধরনও এমন!

সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম সংঘটিত হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার এই চার ঘটনাও সমরূপী। স্থানিক ভিন্নতা সত্ত্বেও সংগঠিত হওয়ার ধরন, কৌশল এবং ভাষা প্রকাশের মাধ্যম বিবেচনায় এগুলো নতুন জামানার আন্দোলনের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে।

২০০৬-২০ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সংঘটিত আন্দোলনের এক জরিপ অনুযায়ী, এ সময়ের আন্দোলনের দাবিদাওয়াগুলোকে মোটাদাগে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথমত রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যর্থতা। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার জনগণ মনে করছে, বিদ্যমান ব্যবস্থা তাদের ধারণ করতে পারছে না। ফলে গণতান্ত্রিক পশ্চাৎ–যাত্রার বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিক্রিয়ায় একধরনের ‘রিয়েল’ বা আসল গণতন্ত্রের দাবি এ সময়ের অধিকাংশ আন্দোলনের মুখ্য দাবিতে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় ইস্যু হচ্ছে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। নয়া উদারনীতিবাদী নীতি গ্রহণের ফলে যেভাবে অর্থনীতিকে সংকুচিত করা হয়েছে, এর ফলে বৈষম্য যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বেকারত্বও। অর্থনৈতিক প্রশ্নটিও তাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। তৃতীয় গুরুতর বিষয় ছিল নাগরিক অধিকার। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নানাভাবে নাগরিক অধিকারসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ ছিল।

সহজ ভাষায় বললে, কয়েক দশক ধরে চলা নয়া উদারনীতিবাদী নীতির কারণে সমাজে বৈষম্য বেড়েছে। এর ধাক্কায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয় ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা কমে গেছে। অকার্যকর রাজনীতি, আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যর্থতা আর সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এসব আন্দোলন-প্রতিবাদের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ প্রতিবাদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ঘটেনি।

বাংলাদেশে যেকোনো আন্দোলনে পুলিশের প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার মোটামুটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। বিগত শাসনামলকে ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘স্বৈরাচারী’, ‘দোআঁশলা’, ‘কর্তৃত্ববাদী’ ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করা হলেও পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এই রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কিংবা আরও নির্দিষ্ট অর্থে বললে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মাত্রাই বাংলাদেশের ঘটনাবলিকে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোর ঘটনাবলি থেকে পৃথক করে দিয়েছে। আন্দোলন-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহেও এর রেশ রয়ে যায়। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এমন তীব্র মাত্রা, যেমন রীতিমতো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছিল, তেমনি এর প্রতিক্রিয়ায় অভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংস ঘটনাবলিরও জন্ম দিয়েছিল। জুলাই মাসের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আমাদের কালেকটিভ বা সামষ্টিক ট্রমার উৎস হয়ে আছে।

বর্তমান দুনিয়াতে যুক্তি ও যুক্তি সংলাপের এই বিপরীতে, একটি বিষয়ে পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের জনগণ এই আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সামনে সহিংসতার বিপরীতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন